শিক্ষা উদ্যোগ | মরহুম মাওলানা এনায়েত উল্যাহ হুজুর এর অবদান
মরহুম মাওলানা এনায়েত উল্যাহ হুজুর এর শিক্ষা উদ্যোগ
সবুজ শ্যামল ছায়া ঢাকা একটি গ্রাম ভবানীগঞ্জ। এটি লক্ষ্মীপুর জেলা সদরের দক্ষিণে রহমতখালী নদীর পাশে অবস্থিত। এখানেই জন্মগ্রহণ করেন একজন আলোকিত মানুষ— মাওলানা এনায়েত উল্যাহ। সমাজের দরিদ্র শিশুদের ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য তিনি নিয়েছিলেন এক মহৎ উদ্যোগ।
গ্রামের শিশুদের অনেকেই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল। তারা হয়তো প্রাথমিক শিক্ষা নিতে পারত না, কিংবা লেখাপড়ার পাশাপাশি পরিশ্রমী হয়ে ওঠার সুযোগ পেত না।
এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে মাওলানা এনায়েত উল্যাহ হুজুর ১৯৮৫ খ্রিঃ প্রতিষ্ঠা করেন একটি মাদরাসা। যার নাম ভবানীগঞ্জ এনায়েতিয়া মাদরাসা। প্রতিষ্ঠিত হলো। কিন্তু জীবনের পড়ন্ত বিকেলে হঠাৎ এই আলোকিত মানুষটির মনে হলো আমি যখন থাকবনা, তখন এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে কে গন্তব্যে পৌছাবে ? কার হাতে এটি পূর্ণতা পাবে ? ভাবতে ভাবতে চোখের কোনদিয়ে মুক্তদানাগুলো কয়েকফোটা গরম জল হয়ে বেরিয়ে গেল।
আত্নিক এ পেরেশানী রাতে ঘুমোতে দিলোনা এনায়েত উল্যাহ হুজুরকে! কি করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। সময়টা ছিলো ২০০২ ইং সনের রামাদান মাস। সকালে ফজরের নামাজ শেষে অনেক ভেবে-চিন্তে জৈষ্ঠ্যপুত্র মাওলানা ইসমাইল হোসাইন আজাদীকে মুঠো ফোনে যোগাযোগ করেন এবং দ্রুত বাড়ী আসার জোর তাগিদ দেন। (প্রসঙ্গত- হুজুরের বড় সাহেবজাদা মাওলানা ইসমাইল হোসাইন আজাদী ঐ সময় শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থানাধীন দারুল ইসলাম মাদরাসায় সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।) মাওলানা ইসমাইল ঈদুল ফিতরের ছুটিতে বাড়ী আসবেন বলে আশ্বস্ত করেন।
যথা সময়ে মাওলানা ইসমাইল হোসাইন আজাদী বাড়ী আসলে বাবা হুজুর মাওলানা এনায়েত উল্যাহ ভবানীগঞ্জ এনায়েতিয়া মাদরাসার বর্তমান হাকীকত ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণে পরামর্শ চাইলে নিজের ব্যাক্তিগত মতামত পেশ করেন। কিন্তু বাবা এনায়েত উল্যাহ হুজুর মনে-প্রাণে চাইলেন যেন ছেলে ইসমাইল এ মাদরাসাটির দায়িত্ব নিক। প্রক্ষান্তরে ছেলে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইলে স্থানীয় ব্যাক্তি জনাব ইসমাইল মেস্তুরী, জনাব নূরাজ্জামান চৌধুরী, জনাব সফিউল্যাহ. আলী আহমদ আনসার প্রমুখের সামনে জৈষ্ঠ্যপুত্র মাওলানা ইসমাইল হোসাইন আজাদীকে এ মাদরাসার দায়িত্ব নিতে জোর অসিয়ত করেন।
অনেকটা অনিচ্ছা সত্বেও মাওলানা ইসমাইল হোসাইন আজাদী নিজ চাকুরী ছেড়ে অবশেষে দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত হন। একই সাথে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি স্বাধীনতা চান। এতে বাবা মাওলানা এনায়েত উল্যাহ হুজুর সম্মতি জ্ঞাপন করেন।
![]() |
| একটি কাঁচা টিনের ঘরের মাধ্যমে শুরু হয় ভবানীগঞ্জ এনায়েতিয়া মাদরাসা |
দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে ভবানীগঞ্জ এনায়েতিয়া মাদরাসাকে মঞ্জিলে পৌছাতে কিছু লক্ষ্য ও কর্মপন্থা ঠিক করেন।
ভবানীগঞ্জ এনায়েতিয়া মাদরাসার মূল লক্ষ্য—
- শিক্ষার্থীদের আদর্শিক যুগোপযোগী ও কর্মমূখী শিক্ষা প্রদান করা।
- শিক্ষার্থীদের মাঝে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধে গড়ে তোলা।
- শিক্ষার্থীদের কর্মঠ ও আত্মনির্ভরশীল মানুষ হিসেবে প্রস্তুত করা।
সময় গড়িয়ে যুগ পার হয়ে গেল। মিশন থামেনি। অভাব অনটন, সীমাবদ্ধতা, মানুষের উৎসাহ অনুৎসাহ, সৎকাজে বাধা দেয়ার কিছু মানুষের চেষ্টা, চলছে তাল মিলিয়ে। এরই মধ্যে এসব গ্রাম্য পলিটিক্সে হতাশার মেঘ আর ঝড়ো বাতাসে স্বীয় স্ত্রীর ইন্তেকাল মাওলানা ইসমাইল কিছুসময় রাজধানীতে অবস্থান করেন।
২০১৪ কোন এক সন্ধ্যারাতে হঠাৎ একটি সেলফোনের রিং...। বাবা মাওলানা এনায়েত উল্যাহর ইন্তেকালের খবর। বাড়ী ফেরা আর বাবার রেখে যাওয়া দায়িত্ব। সময়ের স্রোত থামেনি। সব কিছু চললছে আপন গতিতে। মাদরাসাও ঢীমে তালে।
২০২০ পেন্ডামিক সিচুয়েশান। মাওলানা ইসমাইল হোসাইন আজাদী পিতার অসিয়ত পূর্ণ করার কঠিন সিদ্ধান্তে স্বীয় ভ্রাতা হাফেজ মাওলানা আবদুল হককে সাথে নিয়ে জীবনের চলমান অভিজ্ঞতা ও ফ্রেন্ড সার্কেল এবং গ্রামের মানুষের সহায়তা নিয়ে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত শিক্ষাবন্ধব দৃষ্টিনন্দন ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য দীর্ঘ ত্যাগ ও কুরবানী দিয়ে সাফল্যের দরজায় কড়া নাড়েন।
দাঁড়িয়ে যায় এক মনোরম অবকাঠামো। এখনো নির্মানাধীন। কিন্তু শিক্ষা বিস্তার কার্যক্রম থামেনি। চলছে নতুন গন্তব্যে। শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমূখী জীবন গঠনে এগিয়ে চলছে ভবানীগঞ্জ এনায়েতিয়া মাদরাসা।
মাওলানা এনায়েত উল্যাহ হয়ত নেই! কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া এ মহৎ কাজটি মাথা উঁচু করে মঞ্জিলে পৌছানের রাহে।
গ্রামের মানুষ আজও কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করেন মাওলানা এনায়েত উল্যাহ হুজুরের এই উদ্যোগকে। তার প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা শুধু শিক্ষার আলো ছড়ায়নি, বরং সমাজে নতুন প্রজন্মকে দায়িত্বশীল ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলছে।
শেষ কথা-
মাওলানা এনায়েত উল্যাহ হুজুরের এ মহান উদ্যোগ ও মাওলানা মোহাম্মদ ইসমাইল হোসাইন আজাদীর সফল পরিচালনায় এই মহৎ কাজ আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষার আলো জ্বালাতে তাঁরা যে বীজ বপন করেছেন, তা আজও ফল দিচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানটি হবে আদর্শ ও কর্মঠ নাগরিক তৈরীর মাধ্যম। মহান আল্লাহ এ কাজটি কবুল করুন। হুজুরের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। ভালো কাজ বেঁচে থাকুন যুগ যুগান্তর।
#ভবানীগঞ্জ_এনায়েতিয়া_মাদরাসা #মাওলানা_এনায়েত_উল্যাহ #মরহুম_মাওলানা_এনায়েত_উল্যাহ #শিক্ষা_উদ্যোগ #মাদরাসার_ইতিহাস #ইসলামী_শিক্ষা #নৈতিক_শিক্ষা #কর্মমুখী_শিক্ষা #শিক্ষা_প্রতিষ্ঠান #ভবানীগঞ্জ #লক্ষ্মীপুর #মাওলানা_ইসমাইল_হোসাইন_আজাদী #এনায়েতিয়া_মাদরাসা #মাদরাসা_প্রতিষ্ঠার_ইতিহাস #শিক্ষার_আলো









Comments